বাড়তি ভর্তুকির চাপে সরকার

বরাদ্দের বাইরে গ্যাস ও বিদ্যুতে লাগবে আরো ৩৪ হাজার কোটি টাকা

দেশে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও গ্যাসে ভর্তুকি রাখা হয়েছে মোট ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত আরো ৩৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগ। এর মধ্যে বিদ্যুৎ খাতে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত ২০ হাজার কোটি ও গ্যাস খাতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে জুন পর্যন্ত লাগবে বাড়তি ১৪ হাজার কোটি টাকা। সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে অতিরিক্ত আরো ৩৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধের কারণে বাড়তি দামে জ্বালানি আমদানি করা হচ্ছে। সরবরাহ ঠিক রাখতে হলে আগের ভর্তুকি দিয়ে সরবরাহ ঠিক রাখা সম্ভব নয়। ভর্তুকির বাড়তি অর্থের কথা জানিয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এরই মধ্যে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছে। বিষয়টি এরই মধ্যে অর্থ বিভাগকে জানানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানির মূল্যে অস্থিরতা, উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং বৃহৎ সক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে যুক্ত হওয়ায় ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ব্যয়ও বাড়ছে চলতি অর্থবছরে। চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে বিদ্যুতের চাহিদা মোকাবেলা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র সচল রাখতে এ অর্থ ব্যয় হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

চলতি অর্থবছরে মূল বাজেটে বিদ্যুৎ খাতের জন্য ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ২৬ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। প্রতি মাসে অর্থ বিভাগ ভর্তুকি বাবদ ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকার কিছু বেশি অর্থ ছাড় করছে। এ অর্থের সঙ্গে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অতিরিক্ত আরো ২ হাজার কোটি টাকা করে ভর্তুকি চাওয়া হয়েছে। সেই হিসেবে (মার্চ-ডিসেম্বর) মোট ১০ মাসে ২০ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন বিদ্যুৎ বিভাগের।

চলতি বছরের মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত অতিরিক্ত ২ হাজার কোটি টাকা বেশি দিলে অর্থবছরে ভর্তুকি বেড়ে দাঁড়াবে মোট ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় অন্তত ১৭ হাজার কোটি টাকা কম।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বিদ্যুৎ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিদ্যুতে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি রয়েছে ৩৭ হাজার কোটি টাকা। নতুন করে আরো ২০ হাজার কোটি টাকা চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। নতুন বেশকিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্যাপাসিটিতে যুক্ত হয়েছে। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র সচল রাখলে খরচ আরো বেড়ে যাবে। এ ব্যয় মেটাতে ভর্তুকি বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।’

এদিকে কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্পট মার্কেট থেকে দ্বিগুণেরও বেশি দামে এলএনজি কার্গো কিনতে হচ্ছে পেট্রোবাংলাকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে উচ্চব্যয়ের এ কার্গো দিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক রাখা হচ্ছে। তবে চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে যে পরিমাণ ভর্তুকি রাখা হয়েছিল তা দিয়ে কোনোভাবেই সরবরাহ মোকাবেলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। দ্বিগুণেরও বেশি দামে কার্গো আমদানি অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছরে অতিরিক্ত আরো ১৪ হাজার কোটি টাকা লাগবে। এরই মধ্যে বাড়তি ভর্তুকির বিষয়টি জ্বালানি বিভাগকে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরে আমাদের গ্যাসে ভর্তুকি বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এলএনজির দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গেছে। নতুন করে আরো ১৪ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে। এরই মধ্যে আমরা বিষয়টি জ্বালানি বিভাগকে জানিয়েছি। তবে অতিরিক্ত এ ভর্তুকির হিসাব মার্চের বিশ্ববাজারে গ্যাসের দাম ধরে। দাম বেড়ে গেলে এ হিসাব আরো বেড়ে যেতে পারে। আবার গ্যাসের দাম কমে গেলে ভর্তুকি কমও লাগতে পারে।’

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্যাসে ভর্তুকি বরাদ্দ রয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা। বাড়তি ১৪ হাজার কোটি টাকা দেয়া হলে অর্থবছরে মোট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়াবে ২০ হাজার কোটি টাকা।

পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে মোট ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকির মধ্যে ৫ হাজার কোটি টাকা পেয়েছে পেট্রোবাংলা। আরো ৫০০ কোটি টাকা পাওয়ার কথা রয়েছে, সব মিলিয়ে মার্চের জন্য সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা পাওয়া যাবে। এপ্রিলের কার্গো আমদানির জন্য (১৫ দিনের জন্য) আরো ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি চাওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে এপ্রিলের জন্য প্রয়োজনীয় সব কার্গোও নিশ্চিত করে ফেলেছে পেট্রোবাংলা।

চলতি অর্থবছরে পেট্রোবাংলার মোট কার্গো আমদানির প্রাক্কলন রয়েছে ১১৫টি। সে হিসেবে গড়ে প্রতি মাসে ১০-১১টি কার্গো আসার কথা দেশে। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি দুটি দেশ কাতার ও ওমান থেকে অর্থবছরে মোট ৫৬টি কার্গো আসার প্রাক্কলন রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে কাতার ও ওমান থেকে মার্চ থেকে এলএনজি কার্গো আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতির মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি উৎসের কার্গোও স্পট মার্কেট থেকে কিনছে পেট্রোবাংলা।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি পরিস্থিতির ঘাটতি ও উচ্চমূল্যের কারণে বিপুল অর্থ ব্যয় করে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে সরকারকে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যমান বাজেটে রাখা ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়া সম্ভব নয় বলে সরকারের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে। এমনকি এ ব্যয় চলমান বাজেটে ঘাটতি তৈরি করবে বলে জানিয়েছেন সরকারের মন্ত্রীরা। এ পরিস্থিতির মধ্যে অর্থের সংস্থান ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টিও নিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ মুহূর্তে অর্থের বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে আমরা জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঠিক রাখার চেষ্টা করছি। যেটা সংকট বলা হচ্ছে সেটা একধরনের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে।’ বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে বাড়তি অর্থের কারণে দাম বাড়বে কিনা সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রাইসের বিষয়টি নিয়ে এ মুহূর্তে কিছু বলা যাচ্ছে না।’

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে চলতি অর্থবছরের মার্চ-জুন সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, এলএনজিতে নির্ধারিত ভর্তুকি বেড়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এ সময়ে আরো অন্তত ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বেড়ে যাওয়ার কথা তুলে ধরেন তিনি। গত শুক্রবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিনে এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘এটি একদিকে যেমন সরকারের বাজেট ঘাটতি বাড়াবে, অন্যদিকে সমপরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি মূল্য পরিশোধে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও প্রভাব ফেলবে।’

আরও